আমার সৃষ্টিকর্তা—আল্লাহ
In the name of Allah, the Most Gracious, the Most Merciful
আল্লাহর নামে, যিনি পরম করুণাময়, পরম দয়ালু
ভূমিকা
“তিনি সবকিছুকে সুন্দরভাবে সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা সিজদা ৩২:৭)
আমার সত্ত্বার প্রতিটি পরতে পরতে আল্লাহর সৃষ্টি-সৌন্দর্য অনুভব করি। আমি এক অলৌকিক সৃষ্টি—আল্লাহর হাতে গড়া। গর্ভের একটি বিন্দু থেকে আজকের আমি—প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি হৃদস্পন্দন, আমার দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই এক একটি নিদর্শন।
এই বই শুধুই আমার জীবনের গল্প নয়, এটি এক মহাসত্যের স্বীকৃতি—আমি আল্লাহর এক অপূর্ব সৃষ্টি।
১ম অধ্যায়: আমি কে?
জীবনের পথে চলতে চলতে আমি দেখেছি সুখ-দুঃখ, আলো-আঁধারির বহু চিত্র। ভালোবাসা, বন্ধুত্ব, পরিবার, অর্জন আর ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে যাত্রা করেছি। কিন্তু এইসব অভিজ্ঞতার মাঝে আমি বারবার ফিরে তাকিয়েছি নিজের দি কে—আমি কে? আমার সৃষ্টি কেমনভাবে হয়েছে?
এই আমি, যার চোখ আছে, কান আছে, হাত আছে, মন আছে — আমি কীভাবে তৈরি হলাম? কে আমাকে এমন নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করলেন ? কীভাবে আমি ছোট্ট এক বিন্দু থেকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে উঠলাম ?
এই দেহটা, এই মনটা, এই চিন্তাগুলো—আমি নিজে কি বানিয়েছি ? না, বরং আমি তৈরি হয়েছি এক অলৌকিক পদ্ধতিতে, এক অদৃশ্য পরিকল্পনায়, যার কারিগর হচ্ছেন আমার সৃষ্টিকর্তা—আল্লাহ।
আমি ভাবি—কীভাবে তিনি আমাকে এক ফোঁটা পানির বিন্দু থেকে রক্তের দলায় রূপ দিলেন, তারপর হাড়, মাংস, চর্ম, চেতনা ও চেতনাবিহীন দেহে রূহ ফুঁকে দিলেন!
আমার শ্বাস নেওয়া, দৃষ্টি, শ্রবণ, অনুভূতি—সবই এমন কিছু, যা আমি নিজে তৈরি করিনি, চাইলেও তৈরি করতে পারতাম না। আমার জন্মও ছিল না আমার নিজের হাতে। একটি ক্ষুদ্র বিন্দু থেকে আমার অস্তিত্বের শুরু—মায়ের গর্ভে একটি অদৃশ্য প্রক্রিয়ায় আমি বৃদ্ধি পেতে থাকি। কুরআনে আল্লা হ বলেন:
“আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটি থেকে, তারপর তাকে রাখি নিরাপদ আশ্রয়ে (গর্ভে)।” – (সূরা আল-মুমিনুন, ২৩:১২-১৩)
সেই গর্ভের অন্ধকার থেকে বের হয়ে আমি আলোর মুখ দেখি, কান দিয়ে শব্দ শুনি, চামড়ার স্পর্শে শীত-গরম বুঝি। কে আমাকে এসব দিয়েছেন? আমি তো নিজেই জানি না কীভাবে আমার চোখ গঠিত হয়েছে, কীভাবে আমার হৃদয় প্রতিনিয়ত ধুকপুক করছে। তাহলে একে কাকতালীয় বলা যায় কি?
আমার দুই হাত, পাঁচ আঙুল, দুটি চোখ, হৃদয়, ফুসফুস—সবই অসাধারণভাবে কাজ করছে। যেগুলোর প্রতিটির গঠন ও কার্যপদ্ধতি এত জটিল ও নিখুঁত, যা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীও পুরোপুরি অনুকরণ করতে পারেন না।
“তিনি তোমাদেরকে গঠন করেছেন এবং সুন্দর করেছেন তোমাদের আকৃতি।” – (সূরা আল-ইনফিতার, ৮২:৭-৮)
আজ এই বইয়ের শুরুতেই নিজের জন্য, নিজের মতো প্রতিটি পাঠকের জন্য বলি— আমরা প্রত্যেকেই এক একটি অলৌকিক সৃষ্টি, এক একটি আল্লাহর নিদর ্শন।
আমি জানি না, আগামীতে আমি কতদিন বাঁচব, কিন্তু আজ আমি জানি, আমি কেবলই একটি জীব নয়, আমি একটি উদ্দেশ্যমূলক সৃষ্টি। আমার দেহ, আমার চিন্তা, আমার স্মৃতি—সবই এক মহান পরিকল্পনার অংশ।
অধ্যায় ২: একটি নিরাপদ অন্ধকার ঘর
আমার সৃষ্টি শুরু হয়েছিল এমন এক জায়গা থেকে, যেটা আমি দেখিনি, জানিনি—তবুও যার গভীর নিরবতা ও নিখুঁত পরিকল্পনার মাঝে গড়ে উঠেছিল আমার অস্তিত্ব। মা'র গর্ভ—একটি নিরাপদ অন্ধকার ঘর, যেখানে আমি ছিলাম এক বিন্দু পানির মতো, নির্ভরশীল, নিঃসহায়, অথচ আল্লাহর পরম কুদরতে গঠিত হচ্ছিলাম ধাপে ধাপে।
কোরআনে আল্লাহ বলেন: “অতঃপর আমি ওই শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তে পরিণত করি, তারপর সেই জমাট রক্তকে গোশতের দলায় রূপ দিই…” (সূরা আল-মুমিনূন: ১৪)
কি চমৎকার ছিল সেই সৃষ্টি-পর্যায়! ছোট্ট এক কোষ, তারপর একটু একটু করে হাড়, মাংস, ত্বক, চুল, চোখ—সব কিছুই গড়ে উঠলো একটি অলৌকিক ছকে। কিচ্ছু ছিল না আমার হাতে—তবুও সবকিছু হয়ে গেল যথাসময়ে, যথাযথভাবে।
আমি যখন দুনিয়ায় এলাম, তখন আমি কিছুই জানতাম না। না ভাষা, না চিন্তা, না অনুভূতি—কিন্তু আমার ভেতরে ছিল আল্লাহর দেওয়া এমন এক শক্তি, যা আমাকে শেখাবে হাঁটা, বলা, ভালোবাসা, কাঁদা, হাসা।
কত অসহায় ছিলাম আমি , আর কত দয়ার সাথে আল্লাহ আমাকে গড়ে তুলেছেন! তখন থেকেই আমি ছিলাম আল্লাহর কুদরতের এক চলমান চিহ্ন।
অধ্যায় ৩: চোখের আলো, কানের সুর—আমি কীভাবে অনুভব করতে শিখলাম?
আল্লাহ আমাকে শুধু একটি দেহ দেননি, দিয়েছেন অনুভব করার আশ্চর্য শক্তি। চোখ, কান, ত্বক, মন—সব কিছুই যেন একটি করে জানালা, যার মাধ্যমে আমি পৃথিবীকে দেখতে ও বুঝতে শিখেছি।
আমি প্রথম আলো দেখি—তীব্র, নতুন, অজানা। কিন্তু সেই আলোই তো আমাকে দেখার পথ দেখিয়েছে।
চোখ, দুটি ছোট্ট বলের মতো, কিন্তু আল্লাহ তাতে এমন এক জটিল কৌশল বসিয়েছেন—যা আমার সামনে পৃথিবীকে রঙে, আকারে, আলোছায়ায় জীবন্ত করে তোলে।
একটি শিশুর চোখ ধীরে ধীরে আলোর সঙ্গে পরিচিত হয়। প্রথমে কিছুই বোঝে না, কিন্তু ধীরে ধীরে চিনে ফেলে মায়ের মুখ, আলাদা করে রঙ চিনে, অনুভব করে কোনটা নরম আর কোনটা শক্ত। এই প্রতিটি ধাপে আল্লাহর অপার রহমত প্রকাশিত হয়—যে তিনি অদৃশ্য থেকে ধীরে ধীরে আমাদের সামনে জগৎকে উন্মুক্ত করেন।
কান, প্রথমে শব্দকে শুধু শোনে। এরপর তা পরিচিত হয় শব্দের অর্থে—মায়ের কণ্ঠ, আদরের সুর, হাসির শব্দ, আযানের ধ্বনি। একসময় এই কানই আমাকে বানিয়েছে শ্রোতা, পরে ভাষা বোঝার পথ খুলে দিয়েছে। আমি কথা শিখেছি, মানুষ বুঝেছি, আল্লাহর কালাম শুনেছি—এই কানের মাধ্যমে।
আল্লাহ বলেন: “আল্লাহ তোমাদের মাতৃগর্ভ থেকে বের করেছেন—তখন তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন শ্রবণ, দৃষ্টি ও হৃদয়—যাতে তোমরা কৃতজ্ঞ হও।” (সূরা নাহল: ৭৮)
এই চোখ আর কান ছাড়াও ছিল অনুভব করার শক্তি— হৃদয়, যা কেবল রক্ত পাম্প করে না, বরং ভালো-মন্দ বুঝে, ভয় পায়, ভালোবাসে, আল্লাহকে অনুভব করে। আমি ধীরে ধীরে বুঝতে শিখেছি—কে আপন, কে পর, কোনটা সত্য, কোনটা ভুল। এই জ্ঞান এসেছে সেই অদৃশ্য শক্তি থেকে, যেটি আল্লাহ আমার ভিতর স্থাপন করেছেন।
আজ ৬১ বছরে এসে আমার চোখ হয়তো কিছুটা ঝাপসা, কানে কম শুনি, মনও ক্লান্ত হয়, কিন্তু আমার কৃতজ্ঞতা দিন দিন বাড়ছে—এই উপলব্ধি আমাকে নতুন আলোয় ভরিয়ে দিচ্ছে। আমি সত্যিই আশ্চর্য হই—আমি কীভাবে এত কিছু পেয়েছি, এত কিছু শিখেছি? এর একমাত্র উত্তর: আমার প্রভু, আমার স্রষ্টা—আল্লাহ।
অধ্যায় ৪: আমার হাত, আমার পা — চলার পথ, কাজের শক্তি
শিশু অবস্থায় আমি একসময় হাঁটতে শিখেছি, হাতে ধরেছি জিনিস, টানতে, ধরতে, ফেলে দিতে শিখেছি। তখন এসব ছিল কেবল খেলা, কিন্তু এখন বুঝি—এই ছোট ছোট কাজগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক অসাধারণ প্রশিক্ষণ। আল্লাহ আমাকে এমনভাবে সৃষ্টি করেছেন, যেন আমি ধাপে ধাপে জীবন গড়ার শক্তি পাই।
আমার হাত—এই হাত দিয়েই আমি খেতে শিখেছি, লিখেছি, আঁকতে শিখেছি, কাজ করতে শিখেছি। এই হাত দিয়েই আমি মায়ের হাত ধরেছি, সন্তানের মাথায় হাত বুলিয়েছি, বন্ধুর কাঁধে হাত রেখেছি। এখন ৬১ বছর বয়সে এসেও যখন হাত কাঁপে, আমি তবুও কৃতজ্ঞ—কারণ এই হাতে অনেক স্মৃতি জমা আছে।
আমার পা—প্রথমে কেবল হামাগুড়ি, তারপর ডগডগে হাঁটা, তারপর দৌড়। এই পায়েই আমি মসজিদে গিয়েছি, স্কুলে ছুটেছি, জীবিকার খোঁজে হেঁটেছি মাইলের পর মাইল। এখন হয়তো ক্লান্ত হয় পা, ব্যথাও পায় মাঝে মাঝে, কিন্তু আমি জানি—এই পা আমাকে অনেক দূর নিয়ে গেছে।
আল্লাহ বলেন: “আমি কি তাকে দুটি চোখ দেইনি? এবং একটি জিহ্বা ও দুটি ঠোঁট? এবং আমি কি তাকে দুটি পথ (সৎ ও অসৎ) দেখাইনি?” (সূরা বালাদ: ৮-১০)
এই অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো কেবল দৈহিক কাঠামো নয়, বরং এগুলো আমার জীবনের বাহন, আমার কাজের মাধ্যম, আমার ইবাদতের অংশ। এখন আমি উপলব্ধি করি—এই দেহ আমি নিজে বানাইনি, এ এক মহান কারিগরের সৃষ্টি। তিনি জানেন কীভাবে আমাকে গঠন করলে আমি চলতে পারব, গড়তে পারব, তাঁর দিকে ফিরে যেতে পারব।
অধ্যায় ৫: কথা বলা, ভাষা শেখা—আমি কীভাবে ভাব প্রকাশ করতে শিখলাম?
প্রথম শব্দ— মা। এই একটি শব্দ দিয়েই আমার মুখ খুলেছিল। তারপর আসতে থাকে আরও শব্দ, ভাঙা ভাঙা বাক্য, ধীরে ধীরে পুরো ভাষা। কথা বলা ছিল আমার জীবনের আরেকটি অলৌকিক অধ্যায়। আমি নিজে কিছুই জানতাম না, কিন্তু আল্লাহ এমনভাবে আমার জিহ্বা, ঠোঁট, মস্তিষ্ক এবং শ্রবণক্ষমতা গড়েছেন যে আমি এক সময় বুঝতে শিখলাম—কে কী বলছে, আর আমি কীভাবে উত্তর দিতে পারি।
ভাষা শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়, এটি ভাব প্রকাশের, ভালোবাসা জানাবার, কষ্ট বলার, দোয়া করার, কুরআন তেলাওয়াতের এক মহান উপহার। আমার জিহ্বা, কণ্ঠনালী ও মন—এই সবকিছু মিলেই তো আমার কথার জন্ম দেয়। এটা এমন এক নিয়ামত, যা না থাকলে আমি কখনোই বুঝাতে পারতাম না—আমি কী চাই, কী অনুভব করি, কী জানতে চাই।
আল্লাহ বলেন: “(আল্লাহ) দয়ালু। তিনি কুরআন শিখিয়েছেন, মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তাকে ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন।” (সূরা আর-রাহমান: ১–৪)
আমি ভাবি, এমন সুন্দরভাবে যখন আল্লাহ আমাকে ভাষা ও বাকশক্তি দিয়েছেন, তখন এই শক্তিকে আমি কীভাবে ব্যবহার করেছি? আমি কি শুধু দুনিয়ার কথা বলেই কাটিয়ে দিলাম, না কি আল্লাহর প্রশংসা করেছি, কুরআন পড়েছি, মানুষকে ভালো কথা বলেছি?