461 | ফুল থেকে ফলের সৃষ্টি
ফুল থেকে ফলের সৃষ্টি — মহান আল্লাহর সৃষ্টির এক বিস্ময়কর প্রক্রিয়া
একটি গাছে যখন সুন্দর একটি ফুল ফোটে, তখন আমরা সাধারণত তার রং, সৌন্দর্য ও সুবাস দেখে মুগ্ধ হই। কিন্তু সেই সুন্দর ফুলের ভেতরেই যে একটি ফলের সূচনা লুকিয়ে থাকতে পারে, তা আমরা কতবার গভীরভাবে ভেবে দেখি?
আম, আপেল, কমলা, পেয়ারা, লিচু, বেগুন কিংবা টমেটো, বহু ফলের যাত্রাই শুরু হয় ফুল থেকে। ফুলের ভেতরেই ফল ও বীজ তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হয়। মৌমাছি, প্রজাপতি ও অন্যান্য পোকামাকড় যখন এক ফুল থেকে অন্য ফুলে যায়, তখন ফুলের পরাগরেণু তাদের শরীরে লেগে অন্য ফুলে পৌঁছে যায়। বাতাসের মাধ্যমেও অনেক উদ্ভিদের পরাগরেণু ছড়িয়ে পড়ে। এই প্রক্রিয়াকে পরাগায়ন বলা হয়। পরাগায়নের পর ফুলের ভেতরে নিষেকের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে ধীরে ধীরে ফুলের ডিম্বাশয় বড় হয়ে ফলে পরিণত হয় এবং তার ভেতরের ডিম্বক থেকে বীজ তৈরি হয়। এরপর ফুলের পাপড়িগুলো সাধারণত শুকিয়ে ঝরে পড়ে, আর ছোট্ট ফলটি ধীরে ধীরে বড় ও পরিপক্ব হতে থাকে। যে ফুলটি কিছুদিন আগেও রঙিন পাপড়ি নিয়ে বাতাসে দুলছিল, সময়ের সঙ্গে তার জায়গায় দেখা যায় ছোট্ট একটি ফল।
তারপর সেই ক্ষুদ্র ফলটি ধীরে ধীরে বড় হয়। গাছের শিকড় মাটি থেকে পানি ও প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান গ্রহণ করে। পাতায় সূর্যালোকের শক্তি ব্যবহার করে সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে শর্করা তৈরি হয়। উদ্ভিদের পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে পানি, খনিজ ও তৈরি খাদ্য প্রয়োজনীয় অংশে পৌঁছে যায়। ফলের কোষগুলো বিভাজিত ও সম্প্রসারিত হয়, আর ফল ধীরে ধীরে পরিপক্বতার দিকে এগিয়ে যায়।
আরও বিস্ময়কর হলো ফলের বৈচিত্র্য। একই মাটি থেকে কোনো গাছে জন্মায় মিষ্টি আম, কোনো গাছে টক লেবু, কোনো গাছে রসালো কমলা, আবার কোনো গাছে পেয়ারা। তাদের রং, ঘ্রাণ, স্বাদ, আকার, বীজ ও গঠন একে অপরের থেকে কত আলাদা!
একসময় সেই ছোট্ট ফুলই আমাদের সামনে উপস্থিত হয় পুষ্টিকর ও সুস্বাদু ফল হিসেবে।
একটি ক্ষুদ্র ফুলের ভেতরে পরাগায়ন, নিষেক, বীজ গঠন, ফলের বৃদ্ধি এবং পরিপক্বতার এত সূক্ষ্ম ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া কি মহান আল্লাহর অসীম জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও কুদরত নিয়ে গভীরভাবে ভাবার আহ্বান জানায় না?পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
সূরা আল-আন‘আম, ৬:৯৯
- “আর তিনিই (আল্লাহ) আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, তারপর তা দ্বারা আমরা সব রকমের উদ্ভিদের চারা উদগম করি; অতঃপর তা থেকে সবুজ পাতা উদগত করি। যা থেকে আমরা ঘন সন্নিবিষ্ট শস্যদানা উৎপাদন করি। আরও (নির্গত করি) খেজুর গাছের মাথি থেকে ঝুলন্ত কাঁদি, আংগুরের বাগান, যায়তুন ও আনার। একটার সাথে অন্যটার মিল আছে, আবার নেইও। লক্ষ্য করুন, ওগুলোর ফলের দিকে যখন সেগুলো ফলবান হয় এবং সেগুলো পেকে উঠার পদ্ধতির প্রতি। নিশ্চই এগুলিতে বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে ।”
➡️ এই আয়াতে মহান আল্লাহ বিশেষভাবে আমাদের ফলের সৃষ্টি ও তার পরিপক্বতার দিকে তাকাতে বলেছেন। একটি ফুল থেকে ক্ষুদ্র ফলের সূচনা, তারপর ধীরে ধীরে তার বৃদ্ধি, পরিবর্তন ও পরিপক্ব হওয়া, পুরো প্রক্রিয়াটিই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও চিন্তা করার মতো। একটি ফল শুধু আমাদের খাদ্য নয়। তার ভেতরে থাকা বীজ আবার নতুন একটি উদ্ভিদের সূচনা করতে পারে। সেই নতুন গাছে আবার ফুল আসতে পারে, ফুল থেকে ফল এবং ফলের মধ্যে আবার বীজ। এ যেন সৃষ্টির এক বিস্ময়কর ধারাবাহিকতা।
💎 সুবহানাল্লাহ!
একটি ছোট্ট ফুল থেকে ফলের সৃষ্টি, ফলের ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা ও পরিপক্ব হওয়া, আর সেই ফলের ভেতরে নতুন উদ্ভিদের সম্ভাবনা বহনকারী বীজের গঠন—সব মিলিয়ে এটি এক বিস্ময়কর ধারাবাহিকতা। আমরা প্রতিদিন যে ফলের স্বাদ উপভোগ করি, তার পেছনে রয়েছে পরাগায়ন, নিষেক, কোষের বৃদ্ধি এবং উদ্ভিদের নানা অংশের সমন্বিত কার্যক্রম। এই সূক্ষ্ম ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা আমাদের মহান আল্লাহর অসীম জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও কুদরতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
আসুন, গাছে ফোটা একটি ফুল কিংবা হাতে তুলে নেওয়া একটি ফলের দিকে একটু গভীরভাবে তাকাই। এর সৃষ্টি ও বিকাশ নিয়ে চিন্তা করি, মহান আল্লাহর দেওয়া খাদ্য ও পুষ্টির এই অমূল্য নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞ হই এবং তাঁর সৃষ্টির বিস্ময় উপলব্ধি করার চেষ্টা করি। 🤲