Skip to main content

480 | একটি শিশুর শেখা (How a Baby Learns)

একটি শিশুর শেখা — মহান আল্লাহর দেওয়া বিস্ময়কর ক্ষমতা


একটি শিশু যখন পৃথিবীতে আসে, তখন সে কথা বলতে পারে না, হাঁটতে পারে না; এমনকি নিজের প্রয়োজনও ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। অথচ কয়েক বছরের মধ্যেই সে কথা বলতে, হাঁটতে, মানুষের মুখ চিনতে এবং নতুন নতুন শব্দের অর্থ বুঝতে শেখে। ধীরে ধীরে সে তার চারপাশের বিশাল জগৎ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে শুরু করে।

কেউ তাকে প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে নিয়ম মেনে শেখায় না। প্রতিদিন দেখা, শোনা, স্পর্শ করা, অনুকরণ করা এবং নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তার শেখার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলে। কীভাবে একটি ছোট্ট শিশু এত কিছু শিখে ফেলে? কীভাবে তার মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে অসংখ্য তথ্য গ্রহণ করে, সেগুলো মনে রাখে এবং প্রয়োজনে কাজে লাগাতে শেখে? এর পেছনে রয়েছে মানুষের মস্তিষ্কের অসাধারণ ক্ষমতা, ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে তথ্য গ্রহণের প্রক্রিয়া এবং শেখার এক বিস্ময়কর ব্যবস্থা।

🔸একটি শিশু কীভাবে কথা বলতে শেখে?

জন্মের পর থেকেই শিশু মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে থাকে। মা-বাবার কথা, হাসি, আদর এবং আশপাশের নানা শব্দ তার শ্রবণ-অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে। প্রথমে শিশু কান্না ও নানা ধরনের আওয়াজের মাধ্যমে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে। এরপর ধীরে ধীরে সে বিভিন্ন শব্দ উচ্চারণের চেষ্টা করে। বড়দের কথা শুনতে শুনতে সে শব্দের ধরণ, উচ্চারণ ও ছন্দের সঙ্গে পরিচিত হয়।

একসময় সে “মা”, “বাবা” বা পরিচিত কিছু শব্দ বলতে শুরু করে। পরে শব্দের সঙ্গে অর্থের সম্পর্ক বুঝতে শেখে। দীর্ঘদিন ধরে শোনা, অনুকরণ করা এবং অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তার ভাষাগত দক্ষতা বিকশিত হয়। কেউ শিশুকে ভাষার প্রতিটি নিয়ম আলাদাভাবে বুঝিয়ে না দিলেও, মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ তার ভাষা শেখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

🔸হাঁটা শেখা

একটি শিশু প্রথমে নিজের মাথা স্থির রাখতে শেখে। এরপর গড়িয়ে পড়া, বসা, হামাগুড়ি দেওয়া, কোনো কিছু ধরে দাঁড়ানো এবং অবশেষে হাঁটার চেষ্টা করে। শুরুর দিকে তার চলাফেরা বেশ অনিশ্চিত থাকে। সে ভারসাম্য হারায়, পড়ে যায়, আবার উঠে চেষ্টা করে। বারবার অনুশীলন ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে তার মস্তিষ্ক শরীরের বিভিন্ন অংশ থেকে আসা সংকেতের সঙ্গে পরিচিত হয়।

চোখ তাকে চারপাশের অবস্থান বুঝতে সাহায্য করে। কানের ভেতরের Vestibular System বা ভারসাম্য-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা মাথার অবস্থান ও শরীরের ভারসাম্য সম্পর্কে তথ্য দেয়। পেশি ও জয়েন্ট থেকে আসা সংকেত শরীরের অবস্থান বুঝতে সাহায্য করে। মস্তিষ্ক এসব তথ্য সমন্বয় করে চলাফেরা ও ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। এভাবেই ধীরে ধীরে শিশুর চলাফেরা আরও সমন্বিত হয়। যে কাজটি একসময় কঠিন ছিল, অভ্যাস ও অনুশীলনের মাধ্যমে সেটিই একসময় সহজ হয়ে ওঠে।

🔸 মস্তিষ্ক কীভাবে শেখে?

মানুষের মস্তিষ্কে রয়েছে অসংখ্য Neuron বা স্নায়ুকোষ। এই কোষগুলো পরস্পরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করে তথ্য আদান-প্রদান করে। শিশু যখন নতুন কিছু দেখে, শোনে বা শেখে, তখন মস্তিষ্কের স্নায়বিক সংযোগগুলোর কার্যক্রমে পরিবর্তন ঘটতে পারে। অভিজ্ঞতা, অনুশীলন ও পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে কিছু সংযোগ আরও শক্তিশালী ও কার্যকর হয়ে ওঠে। মস্তিষ্কের এই পরিবর্তন ও মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাকে বলা হয় Neuroplasticity বা স্নায়বিক অভিযোজনক্ষমতা।

এই কারণেই শিশু ধীরে ধীরে পরিচিত মুখ চিনতে শেখে, শব্দ মনে রাখে, কোনো বস্তুর ব্যবহার বুঝতে পারে এবং নতুন নতুন দক্ষতা অর্জন করে। তবে শিশুর শেখার ক্ষমতা শুধু মস্তিষ্কের ওপর নির্ভর করে না। পর্যাপ্ত ঘুম, পুষ্টিকর খাবার, নিরাপদ পরিবেশ, স্নেহ, খেলাধুলা এবং মানুষের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগও তার শেখা ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।


পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:​

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

সূরা আন-নাহল, ১৬:৭৮

  • “আর আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের মায়ের গর্ভ থেকে বের করেছেন এমন অবস্থায় যে, তোমরা কিছুই জানতে না। আর তিনি তোমাদের দিয়েছেন কান, চোখ ও অন্তর, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।”

➡️ কত গভীর এই আয়াতের শিক্ষা! একটি শিশু পৃথিবীতে আসে প্রায় কিছুই না জেনে। কিন্তু মহান আল্লাহ তাকে দিয়েছেন শোনার ক্ষমতা, দেখার ক্ষমতা এবং উপলব্ধি ও চিন্তার সামর্থ্য। তারপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে শব্দ চিনতে শেখে, মুখ চিনতে শেখে, হাঁটতে শেখে, ভাষা শেখে, প্রশ্ন করতে শেখে এবং একসময় নিজের চারপাশের পৃথিবীকে বুঝতে শুরু করে। জ্ঞান অর্জনের এই ধীর ও বিস্ময়কর যাত্রা আমাদের মহান স্রষ্টার অপার প্রজ্ঞার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

একদিন যে শিশু একটি শব্দও বলতে পারত না, সে-ই পরে অসংখ্য শব্দ দিয়ে নিজের চিন্তা প্রকাশ করে। যে শিশু নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারত না, সে-ই একদিন পৃথিবীর পথে হেঁটে চলে। যে শিশু পৃথিবী সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানত না, সে-ই ধীরে ধীরে প্রশ্ন করে, শেখে, চিন্তা করে এবং জ্ঞান অর্জন করে।এই বিস্ময়কর পরিবর্তনের দিকে গভীরভাবে তাকালে আমাদের মনে প্রশ্ন জাগে, মানুষের মধ্যে শেখার এই অসাধারণ সামর্থ্য কে দিয়েছেন? পবিত্র কুরআনের সূরা আন-নাহল, ১৬:৭৮ আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মহান আল্লাহ মানুষকে শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি ও উপলব্ধির ক্ষমতা দিয়েছেন, যার মাধ্যমে সে জ্ঞান অর্জন করে। একটি শিশুর শেখার এই বিস্ময়কর যাত্রা আমাদের সেই নিয়ামতগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়।


একটি শিশুর শেখার যাত্রা নিয়ে একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে সৃষ্টির এক বিস্ময়কর দিক চোখে পড়ে। যে শিশু জন্মের সময় ভাষা জানে না, নিজের পায়ে হাঁটতে পারে না, সে-ই ধীরে ধীরে শব্দের অর্থ বুঝতে, মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে, ভারসাম্য রেখে চলতে এবং অসংখ্য নতুন দক্ষতা অর্জন করতে শেখে। মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষের পারস্পরিক যোগাযোগ, ইন্দ্রিয় থেকে পাওয়া তথ্য এবং অভিজ্ঞতার মাধ্যমে মস্তিষ্কের পরিবর্তন ও অভিযোজন—সবকিছু মিলিয়ে শেখার এক অসাধারণ ব্যবস্থা গড়ে ওঠে। মানুষের এই জ্ঞান অর্জন ও শেখার ক্ষমতা আমাদের মহান আল্লাহর সৃষ্টি-কুশলতা, অসীম জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও কুদরত স্মরণ করার সুযোগ করে দেয়।

আসুন, শোনা, দেখা, বোঝা, মনে রাখা এবং নতুন কিছু শেখার মতো অমূল্য নেয়ামতগুলোর মূল্য উপলব্ধি করি। মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হই, জ্ঞান অর্জনে আগ্রহী থাকি এবং শিশুদের শেখার স্বাভাবিক বিকাশে ভালোবাসা, ধৈর্য ও যত্ন দিয়ে সহায়তা করি।

♥️ সকল প্রশংসা মহান আল্লাহর, যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন এবং অসংখ্য নিয়ামত দান করেছেন।


Ask | প্রশ্ন করুন